ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ই আশ্বিন ১৪২৭


ঢাকায় লকডাউনে আগ্রহী নয় সরকার


প্রকাশিত:
২৪ জুন ২০২০ ০৯:২১

আপডেট:
২৪ জুন ২০২০ ০৯:২১

সারা দেশে করোনাভাইরাস যতটুকু বিস্তার করেছে তার বেশির ভাগই রাজধানী ঢাকায়। তারপরও রাজধানী ঢাকায় লকডাউনে আগ্রহ নেই সরকারের। চলতি সপ্তাহে দুই দফা দেশের ১৫টি জেলার ৩৮টি এলাকাকে লকডাউন ঘোষণা করা হলেও করোনা সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল- রাজধানী ঢাকাকে এই সাধারণ ছুটির আওতাভুক্ত করা হয়নি।

অন্যদিকে করোনার সংক্রমণ হার বিবেচেনায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার চারটি পৌরসভা ও ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাকে ২১ দিনের জন্য লকডাউন করা হয়েছে। অথচ গতকাল পর্যন্ত এ জেলায় আক্রান্ত হিসাবে শনাক্তকৃত ২৮৪ জন করোনা রোগীর মধ্যে ১২০ জন এরই মধ্যে সুস্থ হয়েছেন। বাকিদের মধ্যে বেশির ভাগ সুস্থতার পথে। নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যাও কমছে। তারপরও এ জেলার কিছু এলাকাকে লকডাউন করা হয়েছে।

রাজধানীতে লকডাউনের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন পাওয়ার সাথে সাথেই লকডাউন বাস্তবায়ন নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করে। এর পরের দিনই আমরা কেন্দ্রীয় বাস্তবায়ন কমিটির সমন্বয় সভা করেছি। আমরা আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছি। এখন আমরা এলাকাভিত্তিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। 

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ বছরের শেষ মাসে বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থব্যয়, ব্যাংকগুলোর আর্থিক বছর ক্লোজিং, বাজেট অধিবেশনে সংসদ চালু রাখা উপরন্তু কলকারখানা মালিকদের চাপের কারণে রাজধানীতে লকডাউন দিতে আগ্রহী নয় সরকার। তবে আর্থিক কর্মকা-কে গুরুত্ব দিয়ে রাজধানীতে লকডাউন দিতে দেরী করলে সংক্রমণ আরো বেড়ে যাবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, চলমান পরিস্থিতিতে করোনায় দেশে আরো কত মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করতে পারেন? তা নিয়ে ন্যূনতম টেস্টের ওপর ভিত্তি করেই নতুন করে একটি পর্যালোচনা করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ওই পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংক্রমণের চলমান ঊর্ধ্বমুখী ধারা আগামী এক মাসের বেশি সময় পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এই সময়ে আরো এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে গিয়ে সংক্রমণের মাত্রা নিম্নমুখী হতে শুরু করবে। ঢাকাকে জুলাই মাসে প্রথম সপ্তাহ লকডাউন দিলে পুরো মাসটি কাভার করবে। এরই মধ্যে করোনার পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে বলে মনে করছে তারা। করোনা মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেন, লকডাউন দিতে আমাদের যত দেরি হবে, সংক্রমণ ততই বাড়বে। এমনিতেই সংক্রমণ নতুন মাত্রায় উঠেছে। সংক্রমণ আরো বাড়লে কন্ট্রোল করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। এখনই যা করার আমাদের করতে হবে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উচিত হবে অতি দ্রুত এ জোনিং ম্যাপ সিটি করপোরেশনকে দেয়া। রেড জোনে আইসোলেশন ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত না করলে শুধু লকডাউনে ইতিবাচক ফল আসবে না। পরীক্ষা করে শনাক্ত ও যারা সংস্পর্শে গেছেন, তাদের আলাদা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনা মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির কোনো মতামত আমলে নিচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা আমলারা। তারা যখন যা খুশি করে যাচ্ছেন; সাধারণ ছুটি দিচ্ছেন, লকডাউন ঘোষণা করছেন; লকডাউন কার্যকর থাকা এলাকায় আবারো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করছেন। এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তে করোনাভাইরাস রোধ করা কঠিন হবে।

করোনা অধিক সংক্রমিত দেশের ১০ জেলায় ‘রেড জোন’ (লাল অঞ্চল) ঘোষণা করে ২১ জুন রোববার মধ্যরাতে হঠাৎ প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরের দিন আরো ৫৫টি জেলার ১১ এলাকা রেড জোন ঘোষণা করে বিভিন্ন মেয়াদে সাধারণ ছুটি ঘোষণা হয়। এর আগের সপ্তাহে জোনভিত্তিক এলাকার নাম ঘোষণা করেও পরে তা ফিরিয়ে নেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। আবার লাল, সবুজ, হলুদ এলাকায় করণীয় জানানোর দুই সপ্তাহ পর ১৫ জেলার ৩৮ এলাকা রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো।

বিভিন্ন দেশ কঠোর লকডাউন কার্যকর করে করোনা ঠেকালেও বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে কয়েক দফা সাধারণ ছুটির ঘোষণা করা হয়েছে। ছুটি কার্যকরে প্রায় সারা দেশেই দেখা যায় ঢিলেঢালা ভাব। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘরে থাকা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা বা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায়নি। প্রশাসনও কঠোর হতে পারেনি।

এই অবস্থায় গত ২৬ এপ্রিল থেকে পোশাক কারখানা খুলে দেয়া হয়। এরপর পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে থাকে। সর্বশেষ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ৩১ মে থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সব সরকারি- বেসরকারি অফিস-আদালত, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও কলকারখানা খুলে দেয়া হয়। এতে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলেও করোনা রোধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেই। 

গত ১১ জুন রাত থেকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নটিকে রেড জোন ঘোষণা করে ১৪-২১ দিনের জন্য লকডাউন করে স্থানীয় প্রশাসন। লকডাউনের ১১ দিনের মাথায় এই ইউনিয়নে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে ২১ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত এই এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

লকডাউনের ১১ দিন পর সাধারণ ছুটি ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, লকডাউন যখন শেষপর্যায়ে তখন সাধারণ ছুটি ঘোষণার বিষয়টি হাস্যকর।


বিষয়:



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top